যে বাড়িতে কখনো রাত নামতো না, এখন কেন নামে?





শেয়ার

পিয়ানোটা পড়ে আছে ঘরের এক কোণে। ধুলো পড়ে গেছে। দেখে বোঝা যায় অনেকদিন এখানে কারও হাত পড়েনি। ভায়োলিনের সুরও শোনা যায় না আর। ধানমণ্ডির ১৪ নম্বরের নুর মঞ্জিলের ২য় তলা। এক সময় এ বাড়িতে কখনো রাত নামতো না। বাবা রাত জেগে কাজ করতেন আর তাকে ঘিরে বসে থাকতো সব সন্তানরা। কেউবা পিয়ানো বাজিয়ে শোনাচ্ছে, কেউ ভায়োলিন আবার কেউ গিটার। রাত পেরিয়ে যাচ্ছে ঘুমোতে যাও, ঘুমোতে যাও- ডেকে ডেকে মা নিজেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যেতেন। কিন্তু এখন আর এমনটি নেই নুর মঞ্জিলের ২য় তলায়

 

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের নক্ষত্র প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান করোনার সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠেননি। ২০২১ সালের ১১ই জানুয়ারি চলে গেছেন ওপারে। আপনজনদের ছেড়ে। একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে বদলে গেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ। আজ প্রতিটি ঘরের কোণায় কোণায় যেন তার শূন্যতা। এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে হয়তো নিজেও ভাবেননি। বয়সের হিসাব কষে দেখলে তো যাওয়ার সময় হয়নি। আরও অনেক কাজ তো করার কথা ছিল। মিজানুর রহমান খান সংবাদ মাধ্যমে অনেক বড় বড় কাজ করেছেন যা বাংলাদেশে ইতিহাস হয়ে আছে। হিসাব বিজ্ঞানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করলেও সাংবাদিকতা ছিল তার ধ্যান ও জ্ঞান। আইন বিষয়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও  আইনের ওপর তার  পাণ্ডিত্য দেখে অনেক আইনজ্ঞ অবাক হয়ে যেতেন। মিজানুর রহমান খানের জানার পরিধি ছিল অসীম। কাজপাগল মিজানুর রহমান কাজ নিয়ে পড়ে থাকতেন। কাজের বাইরে অর্থ-বিত্ত তেমনভাবে তাকে টানতো না। পরিবারের নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যাননি তিনি। মিজানুর রহমান খানের স্ত্রী আনজিনা খান শিরীন বলেন- সন্তানদের  যোগ্য করে গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন ছিল। আমাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে শাদমান মিজানুর খান, মেয়ে আফসারা মিজানুর খান ও ছোট ছেলে আনান মিজানুর খান। সন্তাদেরকেই সম্পদে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সময় তো তিনি পেলেন না। বড় ছেলে শাদমান মিজানুর খানকে ব্যারিস্টার বানাতে চেয়েছিলেন। যেহেতু তার নিজের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইন বিষয়ে লেখাপড়া না থেকেও আইন বিষয়ে এত কিছু জানতেন। তাই তিনি চাইতেন তার একজন সন্তান অন্তত আইন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করুক। সাদমান এল.এল.এম শেষ করেছে। শাদমানের মা বললেন তার পক্ষে তো এত টাকা খরচ করে ছেলেকে লন্ডনে  পাঠিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ানো সম্ভব নয়। ওর বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো তার স্বপ্ন পূরণ হতো। বুক ভরা ব্যথা আর  অঝোরে চোখের পানি ফেলে আনজিনা খান বলেন- সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। এই মনে হয় স্বপ্ন ভেঙে যাবে আর সব আগের মতো ঠিকঠাক হয়ে যাবে। ওকে তো আমি মৃত অবস্থায় দেখিনি। আসলে আমি ওকে ওভাবে দেখতে চাইনি। আমি চেয়েছি- ওর যেন হাসি মুখটাই আমার চোখের সামনে ভাসে। আত্মীয় সূত্রে মিজানুর রহমান খানকে সেই ছোটবেলা থেকে  চেনেন আনজিনা খান। ছোটবেলার খেলার সাথী ছিলেন তারা। সেই খেলার সাথী হয়ে যায়  একসময় জীবন সঙ্গী। আনজিনা শিরীন বলেন- মিজানুর রহমান খান আমার খালাতো ভাই। আমরা প্রায় সমবয়সী। যখন আমরা বছরে একবার নানা বাড়িতে যেতাম মিজানরাও আসতো তখন এক সঙ্গে খেলাধুলা করতাম। এভাবেই  খেলতে খেলতে কখন যে ভালোলাগা সৃষ্টি হয়েছিল বলতে পারবো না। ও সব সময় ছিল অন্যরকম। লেখাপড়ার মধ্যেই ছিল। কোনো কিছু একবার চোখ বুলিয়ে দেখলে সেটা সে কোনোদিন ভুলতো না। মিজান যখন বাংলাবাজার পত্রিকায় তখন আমাদের বিয়ে হয়। প্রায় ত্রিশ বছর আমরা সংসার করেছি। আমার সংসার জীবনে ওকে কাজের বাইরে কখনো অন্যকিছু চিন্তা করতে দেখিনি। হয়তো সে পড়ছে, না হয় লিখছে। একদিন সে হঠাৎ করে মার্কেটে গেছে তার একটা শার্ট কিনতে। মার্কেট থেকে আমাকে ফোন দিয়েছে তার কলারের মাপ কত সেটা জানতে? কারণ এর আগে মিজান কখনো নিজের কাপড় কিনেনি এ জন্য কলারের মাপ কত এটাও জানতো না। তার পরিধানের সব কাপড় আমি কিনতাম। খেতে বসলেও কি যেন ভাবতো? সামনে কয়েক রকম তরকারি দেয়া থাকলেও হয়তো এক তরকারি দিয়েই খেয়ে উঠে যেত। দিনে-রাতে সব মিলিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমোতো। আমি হয়তো বলতাম- তুমি ঘুমাও না কেন? তখন সে আমাকে বলতো মানুষ তো মরে গেলে ঘুমিয়ে থাকে তখন তার কিছুই করার নেই। যতদিন বেঁচে আছি কাজ করে যাবো। ২০২০ সালে করোনা যখন বাংলাদেশে শুরু হলো তখন কেন যেন সে শুধু বলতো আমাদের তো একটা মাথাগোঁজার ঠাঁইও নাই। যদি আমি করোনায় মারা যাই তখন তোমাদের কি হবে? মিজানের একথাটা শুনতে আমার ভালো লাগতো না। আমি বলতাম কি বলো এইসব? কেন তোমার করোনা হবে? ২০২০ সালের  অক্টোবরের দিকে প্রথম করোনা ধরা পড়ে মিজানের। ভালোও হয়ে যায়। আবার নিয়মিত প্রথম আলোতে যাওয়া শুরু করে। আমি শুধু বলতাম তোমার একবার করোনা হয়েছে সাবধানে থাকো। কিন্তু ও কাজ নিয়েই পড়ে থাকতো। মিজান সকালে বের হতো কিন্তু ওর ফেরার কোনো সময় ছিল না। অনেক সময় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলতেন মিজান বাসায় যাও না কেন? তোমার কি সংসার নেই? যত রাতেই বাড়ি ফিরুক না কেন বাসায় এসেই তিন সন্তান আর আমাকে তার কাছে বসে থাকতে হবে। সে হয়তো রাত জেগে কাজ করছে, হয়তো আনানকে বলতো পিয়ানো বাজাও, নয়তো আফসারাকে বলতো ভায়োলিন বাজাতে, সাদমানকে বলতো গিটার বাজাতে। নয়তো কেউ বাবার চুল টেনে দিচ্ছে, হাত টিপছে বা পা টিপছে। সবাইকে তার সঙ্গে থাকতে হবে। সে চাইতো সন্তানরা শুধুমাত্র লেখাপড়া করবে না সেই সঙ্গে অন্য ভাষা শিখবে, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখবে। ও চলে যাওয়ার পর আমি যেন অথৈ সাগরে পড়ে গেলাম। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তিনি বলেন, আমার তো তেমন কোনো সহায়- সম্পত্তি নেই। ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। আমি কীভাবে চলবো? মিজানুর রহমান খানের কর্মক্ষেত্র প্রথম আলো সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে, আমাদের পাশে দাঁড়ায়। মিজানুর রহমান খানের বড় ছেলে শাদমান মিজানুর খান এল.এল.এম শেষ করে এখন বেলা’য় কাজ করছেন। শাদমান বলে, আব্বুর অভাব তো পূরণ করা যাবে না। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে আমি চেষ্টা করছি শক্ত হতে। আম্মু, ছোট ভাই ও বোনকে খুশি রাখতে। আম্মু আব্বু চলে যাওয়ার পর থেকে একদম বাসা থেকে বের হতে চান না। আব্বু চলে যাওয়ার প্রায় দেড় বছর হতে চলেছে। এর মধ্যে আম্মুকে মাত্র দু’বার বাইরে খেতে নিয়ে যেতে পেরেছি। আমার আব্বুর স্বপ্ন ছিল আমাকে ব্যারিস্টার বানাবে। আমি আমার আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করতে স্ট্রাগল করছি। কিন্তু লন্ডনে বার এট ল’ করতে এত টাকা লাগে। আমি হিসাব করে দেখেছি আগামী পাঁচ বছরেও আমি এ টাকা যোগাড় করতে পারবো না। আব্বু চলে যাবার পর আমার খুব চাপ অনুভব হতো। দাদাবাড়ি বা নানাবাড়ি যেকোনো ঝামেলায় সবাই আমার সিদ্ধান্ত জানতে চাইতো। যখন থেকে আমি ভাবলাম আব্বুতো এসব ঝামেলা সামলেই সফল হয়েছে- তাহলে আমি কেন পারবো না। আমি এখন নিজেকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, আব্বুর ছেলে হয়ে যেন ব্যর্থতার পরিচয় না দেই। নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারি। আমি প্রতি শুক্রবার আব্বুর কবরে যাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আব্বুর জন্য দোয়া করি। আল্লাহ যেন আব্বুকে ভালো রাখেন। মিজানুর রহমানের ২য় সন্তান আফসারা মিজানুর খান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিটেকচারে লেখাপড়ার পাশাপাশি মেনটরস-এ ইংরেজির শিক্ষকতা করছেন। আফসারা বলেন, আব্বু থাকলে তো আমরা সবাই মিলে রাত জেগে আড্ডা দিতাম আব্বুর স্ট্যাডিরুমে। আব্বুু অফিস থেকে ফিরেই বলতেন  সারাদিন দেখিনি, সবাই আসো। আর এখন তো কারও সঙ্গে তেমন ভাবে কথাও হয় না। খাওয়ার টেবিলে শুধু কথা হয়। যার যার রুমে সে সে থাকি। আব্বুর স্ট্যাডি রুমটিও এখন বন্ধ থাকে। কেউ আর সেখানে যায় না। মিজানুর রহমানের সবচেয়ে আদরের সন্তান আনান মিজানুর খান। বাবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছোটবেলা থেকেই স্কুল বন্ধ থাকলেই সে বাবার সঙ্গে নিয়মিত অফিস করতো। বাবা চলে যাওয়াতে এক সময় কথার মেশিন আনান একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। আনান এবার ও’ লেভেল দিবে। আনানের কথা, আব্বু আমাকে পিয়ানো বাজানো শিখিয়েছে। ফ্রেন্স ও চাইনিজ ভাষা শিখিয়েছেন। কিন্তু এখন যদি আমাকে এসব করতে বা বলতে বলেন আমি কিছুই পারবো না। আব্বু চলে যাওয়ার পড়ে আমি আর প্র্যাকটিস করিনি। আমি এখন শুধু আমার লেখাপড়া নিয়ে আছি। আব্বুর সঙ্গে আমি স্কুল না থাকলে অফিসে যেতাম। আব্বু অনেক রাত পর্যন্ত অফিস করতো। মা ফোন দিয়ে বকাবকি করতো আসিস না কেন? তারপরও আব্বু আমাকে নিয়ে যেত। একদিন হলো কি প্রথম আলোতে আব্বু রাত দুইটা পর্যন্ত অফিস করছে, আমি তার সঙ্গে আছি। পুরো অফিসে আর কেউ নেই। তো আমি দরজা খুলতে গেছি, দেখি পেছন থেকে আমাদের তালা দিয়ে গেছে। আমি বললাম- আব্বু আমরা তো যেতে পারবো না। তারপর আব্বু কাকে যেন ফোন দিলো। একজন এসে দরজা খুলে দিলো। এরকম কত স্মৃতি আব্বুকে নিয়ে।

 

সারাদেশ


শেয়ার