আজকের সর্বশেষ

সভাপতি- খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক- কেফায়েতুল্লাহ কায়সার। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা চট্টগ্রাম বিভাগের নতুন কমিটি

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হলেন চট্টগ্রামের সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম, ও যুগ্ম মহাসচিব কেফায়েতুল্লাহ কায়সার

চ্যানেল কৃষি সন্মাননা পেলেন লেখক ও সংগঠক শামছুল আরেফিন শাকিল

চ্যানেল কৃষি সন্মাননা পেলেন নির্মাতা ও অভিনেতা মোশারফ ভূঁইয়া পলাশ

আইএফআইসি ব্যাংক শিবের হাট উপশাখা উদ্বোধন

জাপান বুঝিয়ে দিলো ফুটবল শুধু পশ্চিমের নয়

বাকবিশিস'র ১০ জাতীয় সম্মেলন সম্পন্ন : ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার সভাপতি, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত

অধ্যক্ষ শিমুল বড়ুয়া বাকবিশিস'র কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত


জিম্মি দশায় মানুষ





শেয়ার

রমজান মাসে ভোজ্য তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা বেঁধে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু এ দামে সন্তুষ্ট ছিলেন না ব্যবসায়ীরা। আরেক দফা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবও করেছিলেন তারা। তবে রমজান মাসে তেলের দাম বৃদ্ধি না করতে ও সরবরাহ সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। মন্ত্রীর সেই অনুরোধও রাখেননি ব্যবসায়ীরা। রমজানের শেষের দিকে এসে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন তারা। ভোক্তাদের ফাঁদে ফেলে ১৬০ টাকা লিটারের তেলের দাম নেয়া হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকা। ব্যবসায়ীদের এমন কারসাজির মধ্যেই আচমকা আরেক দফা বাড়ানো হয় দাম। এক লাফে বোতলজাত সয়াবিন লিটারে ৩৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেরাই এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন

বিজ্ঞাপন  

এ নিয়ে গত ৪ মাসের মধ্যেই তৃতীয় দফায় বাড়ানো হলো ভোজ্য তেলের দাম। দাম বৃদ্ধি নিয়ে বরাবরই আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির ফলে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই বাড়ানো হচ্ছে দাম। অনেকের অভিযোগ, বাড়তি মুনাফা লাভের জন্যই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি করে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ঈদের আগে থেকেই তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়। ভোক্তাদের জিম্মি করে নেয়া হয় বাড়তি দাম। স্বয়ং সরকারও এসব ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার যেকোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও তা মানা হয় না। বরং ইচ্ছেমতো দফায় দফায় বাড়ানো হয় দাম। গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকার বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তারা তা রাখেননি। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয় নেই। 

 

ব্যবসায়ীদের কারসাজি প্রসঙ্গে গতকাল সাংবাদিকদের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছিলাম দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। কিন্তু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আমার অনুরোধ রাখেনি। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেনি। বিশেষ করে, বড় ব্যবসায়ীরা তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখলেও মাঝপথে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তেল নিয়ে কারসাজি করেছে। আর এ কারণে ঈদের ১০ দিন আগে থেকে বাজারে ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দেয়।

বিশ্ব চলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে। আর মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সিন্ডিকেশন বলে কিছু নেই বলে দাবি করেন বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও টি কে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হায়দার। তিনি মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে সিন্ডিকেট করে কিছু হয় না। কারণ আধুনিক বিশ্বে যে কেউ জানে কোন দেশে কি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, কি ঘটনা ঘটছে। সবার কাছে সব তথ্য আছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন টনপ্রতি ১৯৫০ ডলার। আর পামঅয়েল ১৮০০ ডলার। এখন সরকার যে রেট দিয়েছে এই রেট থেকেও উপরে পড়বে বর্তমান আন্তর্জাতিক মূল্য। এরমধ্যে আবার ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে রোজার ঈদের ৭-৮দিন আগেও ছিল ৮৮ টাকা, এখন সেটা হয়েছে প্রায় ৯৫ টাকার উপরে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিস্থিতিতে আমাদের আসলে করণীয় কিছুই নেই। আমাদের সোর্স করাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে ইন্দোনেশিয়াতেও ব্যান হওয়ায় তারা এক্সপোর্ট অ্যালাও করছে না। সব চাপ পড়েছে মালয়েশিয়ার উপরে। আর মালয়েশিয়াও মে মাসে কোনো অফার দেয়নি।  তিনি বলেন, সরকার ভ্যাট কমিয়ে দেয়ার ফলে কিছুটা কম আছে, নাহলে তো তেলের দাম আরও বাড়তো। ৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়া হচ্ছে। তারপর আবার বিভিন্ন খরচ আছে।

বেসরকারি ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে তেলের সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যেরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও সিন্ডিকেট করে বাজার অস্থিতিশীল করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামান্য জরিমানার মতো লঘুদণ্ড দেয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করছে না। বরং ভোক্তাকে জিম্মি করার এই প্রবণতা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এখন খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাও ভোজ্য তেল লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। 
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। নিজস্ব জোগান বাদ দিয়ে ১৮ লাখ টন তেল আমদানি করতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১৮ লাখ টনের বেশি তেল আমদানি করা হয়েছে। ফলে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে মিল থেকেও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করেছে। 

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর পর বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দর বাড়তে থাকায় দেশের ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর পক্ষে বলে আসছিলেন। এর মধ্যে রোজার ঈদের আগে হঠাৎ করেই খুচরা বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও হয়ে যায়। যদিও আমদানিতে কোনো সংকট ছিল না। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৭ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেল ১৪৩ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে মিল মালিকরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রণালয়ে গেলেও সরকার সায় দেয়নি। গত মার্চের মাঝামাঝিতে তেলের আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের পর ইদের আগে লিটারে ৮ টাকা করে দাম কমানো হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল ও মে মাসে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিতে থাকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। দাম বৃদ্ধির আশায় ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতারাও তেলের মজুত শুরু করে। এসব ঘটনা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ধরা পড়ে।

‘ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা ভুল হয়েছে’
ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে বাজারে ভোজ্য তেলের সংকট প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা আমার ভুল হয়েছে। এটি আমার ব্যর্থতা। আমরা ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেননি। বিশেষ করে, বড় ব্যবসায়ীরা তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখলেও মাঝপথে মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরা (ডিলার) ও খুচরা বিক্রেতারা তেল নিয়ে কারসাজি করেছে। আর এ কারণে ঈদের ১০ দিন আগে থেকে বাজারে ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দেয়। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্‌শি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছিলাম দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। কিন্তু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আমার অনুরোধ রাখেননি। তাদের অনুরোধ করা আমার বড় ভুল হয়েছে। আমাদের ব্যর্থতা ঠিক, কারণ বলেছিলাম রমজানকে সামনে রেখে দাম বাড়াবেন না। কিন্তু তারা ঈদের ১০ দিন সেই কথা রাখেননি। আমাদের সব অর্গানাইজেশনকে বলেছি, যে দাম নির্ধারিত আছে সেটি যাতে ঠিক রাখা হয়। কিন্তু দাম বাড়বে ভেবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তেল লুকিয়ে রাখে।
ঈদের আগে পরে বাজারে তেল না পাওয়া প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ দাম ঠিক করেছিলাম। চিটাগাং পোর্টে যে প্রাইসে মাল রিলিজ হয় সে অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। ২০শে মার্চ আমরা অনুরোধ করায় সরকার ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করে। তখন ৮ টাকা দাম কমানো হয়। তখন আমরা রমজান মাসে তেলের দাম না বাড়াতে অনুরোধ করেছিলাম, ব্যবসায়ীরা একমত হয়েছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল রমজানের পর আমরা আবার বসবো। যারা বড় প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক তথ্য নিয়েছি। কিন্তু মাঝপথে ঝামেলা হয়েছে। বিশেষ করে রি-টেইলার ও ডিলার, তারা কোথাও কোথায় তেল স্টক করে কিংবা সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। কারণ তারা জানতো রমজানের পর তেলের দাম বাড়বে। এই কারণে তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেন। তবে লাখ লাখ রি-টেইলার হওয়ার কারণে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। তারপরেও আমাদের অভিযান চলছে। বেশকিছু জায়গায় মজুত তেল পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
টিপু মুনশি বলেন, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কোনো নমুনা পাইনি। রি-টেইলার, ডিলাররা সুযোগটা নিয়েছে। আমরা চেষ্টা করবো রি-টেইলার থেকে ডিলার পর্যায়ে কেউ যেন সুযোগ নিতে না পারে। লাখ লাখ ডিলারের সিন্ডিকেট করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ফলে আমাদের বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে। কারণ ব্যবসায়ীরা লাভ করার জন্য ব্যবসা করে। তবে সেই লাভটা যেন সহনীয় থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শীলঙ্কা, পাকিস্তানে তেলের দাম আমাদের চেয়ে এখনও বেশি। তবে নেপালে তেলের দাম আমাদের সমান।

 

সারাদেশ


শেয়ার