চা বোর্ডের উদ্যোগ ও অনুকুল আবহাওয়ায় চট্টগ্রাম ভ্যালির নতুন দিগন্ত





শেয়ার

অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে বাংলাদেশ চা শিল্প ২০২১ সালে সর্বোচ্চ পরিমাণ চা উৎপাদন করে। এ বছর ৯৬ দশমিক ৫০৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপন্ন করে। এটি চা বোর্ডের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। তবে গত বছর (২০২১) অন্যান্য সকল ভ্যালিতে চা উৎপাদন ২০২০ সালের চেয়ে বেশি হলেও চট্টগ্রাম  ভ্যালির ২৩টি বাগানে ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। যা ২০২০ সালের তুলনায় কম।

 

২০২১ সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম ভ্যালির ৩৫ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৩৯ একর আয়তনের ২৩টি চা বাগানে তুলনামূলক কম চা উৎপাদন হয়েছে। চট্টগ্রাম ভ্যালিতে ২০১৯ সালে চা উৎপাদন হয়েছিল ১১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন কেজি, ২০২০ সালে উৎপাদন হয়েছিল ১১ দশমিক ২৩ মিলিয়ন কেজি এবং ২০২১ সালে উৎপাদন হয়েছিল ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি। কিন্তু চট্টগ্রাম ভ্যালিতে চা উৎপাদন কম হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে ভাবিয়ে তুলে। কম উৎপাদন হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে চা বোর্ড।  

 

চা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিলম্বিত বৃষ্টিপাত, খরা, দুর্বল সেচ ব্যবস্থাপনা ও প্রুনিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং পোকা মাকড়ের আক্রমণের ফলে চট্টগ্রাম ভ্যালিতে চা উৎপাদন নিন্মমুখী হওয়ার প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম ভ্যালির বাগানগুলোতে ২০২১ সালে তুলনামূলক কম চা উৎপাদন হওয়ার কারণ পর্যালোচনা এবং এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাগান ব্যবস্থাপকদের নিয়ে বাংলাদেশ চা বোর্ড একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভা করেছে। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞানী এবং প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞরাও উক্ত সভায় সংযুক্ত ছিলেন। 

 

সভায় বিশেষজ্ঞরা চট্টগ্রাম ভ্যালির চা বাগান সমূহের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে অর্গানিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, সঠিক প্রুনিংসাইকেল অনুসরণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রোগ বালাই দমনসহ সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ প্রদান করেন। বাংলাদেশ চা  বোর্ড এবং এর আওতাধীন বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটউট ও প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট দেশের সকল বাগানকে নিয়মিত বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে। 

 

চট্টগ্রাম ভ্যালির বাগান সমূহে চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সেবার মান বৃদ্ধি এবং সেবা প্রাপ্তি সহজ করার লক্ষে চা বোর্ড বিটিআরআই ফটিকছড়ি উপ কেন্দ্রে আধুনিক মৃত্তিকা বিশ্লেষণ গবেষণাগার স্থাপন করে। এই গবেষণাগারকে কার্যকর করতে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে একজন সার্বক্ষণিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (মৃত্তিকা বিজ্ঞান) নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ চা বোর্ড।

 

পূর্বে মাটির নমুনা বিশ্লেষণ, সারের নমুনা বিশ্লেষণ, সারের মাত্রা নির্ণয় পূবক সুপারিশমালা প্রণয়নের নিমিত্তে মাটির নমুনা বিটিআরআই, শ্রীমংগল, মৌলভীবাজারে প্রেরণ করা হতো। এতে সময় লাগতো ৫-৭ দিন (কুরিয়ার প্রাপ্তি প্রেরণ)। কিন্তু মৃত্তিকা বিশ্লেষণ গবেষণাগার স্থাপনের ফলে মাটি ও সারের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে দ্রুততার সঙ্গে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এখন সর্বোচ্চ মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে সেবার গতি বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে অর্থও সাশ্রয় হচ্ছে।

 

পূর্বে মাটির নমুনা পাঠানো হত শ্রীমঙ্গল, মৌলভী বাজার। এখন ফটিকছড়ি উপকেন্দ্রেই মৃত্তিকা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফলে চা এর কারিগরি সেবা এখন হাতের নাগালে। সার এবং মৃত্তিকা বিশ্লেষণের পাশাপাশি ফটিকছড়ি উপকেন্দ্রে একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগ তত্ত্ব) সার্বক্ষণিক চা বাগানের রোগ বালাই দমনে প্রয়োজনীয় সব সেবা দিচ্ছেন। উপকেন্দ্রের এই কর্মকর্তা হোয়াটস এ গ্রুপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছেন। এই গ্রুপে যুক্ত আছেন ভ্যালির বিভিন্ন বাগানের ব্যবস্থাপকগণ। যেকোনো রোগের ক্ষণ/পোকার আক্রমণ দেখা দেয়া মাত্রই তার ছবি তুলে গ্রুপে দিচ্ছেন বাগান কর্তৃপক্ষ। সেই ছবি দেখে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন উদ্ভিদ রোগ তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ জনাব মশিউর রহমান আকন্দ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের এসব উদ্যোগে চট্টগ্রাম ভ্যালির চা আবাদের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে এসেছে স্বস্তির নিঃশ্বাস।  

 

এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টিপাত হয়েছে। আশাও করা হচ্ছিল এ বছর চায়ের উৎপাদন ভালো হবে। সেই আশা বাস্তবে রূপ পাওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। 

 

বছরের প্রথম পাঁচ মাসের (জানুয়ারি-মে) উৎপাদন আশা জাগাচ্ছে। গত বছর (২০২১) মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম ভ্যালিতে মোট উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ১৭০ কেজি। এ বছর একই সময়ে এখন পর্যন্ত মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৬১০ কেজি। গত বছরের চেয়ে এই বছরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৬ শতাংশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এগিয়ে যাবে দেশের চা শিল্প এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। 

 

চা শিল্প দেশের অন্যতম একটি সম্ভাবনাময়ী খাত। প্রতিনিয়তই এ শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হচ্ছে। হচ্ছে সম্প্রসারণ। প্রতিনিয়তই বাড়ছে উৎপাদন। উৎপাদনে বাড়ছে চা বাগান। চা সেবায় যোগ হচ্ছে ডিজিটাল কার্যক্রম। বাড়ছে  বিনিয়োগ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। সমতলেও হচ্ছে চা উৎপাদন। রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ২৩টি দেশে। চা শিল্পে সম্ভাবনার হাতছানি ক্রমশ বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে চট্টগ্রাম ভ্যালির সম্ভাবনাও। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সময়োপযোগী  উদ্যোগ ও অনুকুল আবহাওয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে চট্টগ্রাম ভ্যালির। 

মোহাম্মাদ রুহুল আমীন

সচিব, বাংলাদেশ চা বোর্ড

মুক্তমত


শেয়ার