স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের পাওয়া-না পাওয়া ও প্রত্যাশা।। মো. রেজাউল করিম চৌধুরী





শেয়ার

শুভ নববর্ষ ২০২১

২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন ও শোষনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত বর্ষ। দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে সমগ্র ভারত বর্ষ থেকে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে পৃথক রাষ্ট্র। ভারত বর্ষের পূর্বাংশের পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশকে জুড়ে দেয়া হয় একেবারের পশ্চিম অংশের পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে। ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্ব প্রায় ১৩০০ মাইল। দৈহিক গড়ন, ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ কোন দিক থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের কোন মিলই ছিলনা। লাগামহীন ছলনা, বঞ্চনা, শোষন, নিপীড়ন, নির্যাতন আর বৈষম্যের কারণে পূর্ব বাংলার মানুষকে নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম, সংঘাত ও রক্তাক্ত পথে স্বাধীনতার দিকে এগুতে হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক উর্দূকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা ঘোষনা করা হলে জন্মলগ্নেই পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার মতদ্বৈততার শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সূচিত স্বাধীনতার আকাঙ্খা থেকে ৫৪’র নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী বাঙালি ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত ও হাজারো মুক্তিযোদ্ধার পঙ্গুত্ব বরণের পর ছিনিয়ে আনে মহান গৌরবময় বিজয়। পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

 

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারী বাঙ্গালির প্রাণের নেতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, ইতিহাসের রাখাল রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ। নেই অবকাঠামো, ভঙ্গুর অর্থনীতি, খাদ্যের অভাব। বঙ্গবন্ধু শূন্য থেকে শুরু করেন দেশ গঠনের কাজ। মাত্র তিন বছরেই বঙ্গবন্ধুর অসীম মনোবল, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় ৭.৪ শতাংশ। স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু ও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রত্যক্ষ মদদ ও প্ররোচনায় বিপথগামী সেনা কর্তৃক ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সেই রেকর্ড ৪০ বছর পর্যন্ত কোন সরকারই স্পর্শ করতে পারেনি। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি আমলে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.০৫ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৮.১৫ শতাংশে। 

 

বিগত অর্থবছর (২০১৯-২০) শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলার। তার আগের অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১৯০৯ ডলার। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার গঠনের সময় এ রিজার্ভ ছিল মাত্র ৭০৩ মার্কিন ডলার।

 

২০০৮-০৯ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭,৪৭০.৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর জননেত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষন নেতৃত্বে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের হয়ে এ.এম.এ. মুহিতের প্রথম বাজেট ছিল ২০০৯-১০ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এবারে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই দশকে বাজেটের আকার বেড়েছে ৪ গুন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল ২৭ টি। এখন ১১৩টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র যুক্ত হয়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০ টিতে।

 

বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪,৯৪২ মেগাওয়াট। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩,৭৭৭ মেগাওয়াট। গ্রামীন অবকাঠামোসহ সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে অভাবনীয় মাত্রায়। প্রত্যেক উপজেলায় এই দশকে প্রায় গড়ে ৫০ কোটি টাকারও বেশী টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। এছাড়া মহাসড়ক গুলোকে চার লেনে উন্নীতকরণ, যমুনা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নসহ সারাদেশে অসংখ্য সেতু নির্মান, চলমান পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মান, কর্ণফুলী টানেল, রাজধানীতে মেট্রো রেল, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মান দেশের অবকাঠামোর চিত্রকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিচ্ছে।

 

৪ হাজার ৫৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপিত ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে প্রযুক্তির সেবা পৌঁছে গেছে দেশের তৃণমূলে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। দেশের সবক’টি উপজেলাই ইন্টারনেটের আওতাধীন। টেলিযোগাযোগ উন্নয়নের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, এমনকি ব্যাংকিং কার্যক্রম এখন ঘরে বসেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে করা সম্ভব হচ্ছে। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও খাদ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। বিগত বছরগুলোতে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ টন। 

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক মহামারি, দারিদ্র্য দূরীকরণে যথাযথ ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ ছাড়াও বিশেষত শিক্ষা সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস করা, দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা- প্রভৃতি জনহিতকর কার্যক্রমের জন্য বর্তমান বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এক অনন্য নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ মানুষ মারা গেলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৭০০০ এর কম। জাতিসংঘ বাংলাদেশে দুই মিলিয়ন মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে বলে ধারণা করেছিল। বিচক্ষন নেত্রী শেখ হাসিনার সময়োচিৎ পদক্ষেপে বাংলাদেশ তেমন ক্ষতির সম্মূখীন হয়নি। করোনার কারণে বিপর্যন্ত বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতেও বাংলাদেশ ৫.২৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সরকারী, বেসরকারী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের সমীক্ষায় উঠে আসা উপরোক্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষন করে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকে যদি হত্যা করা না হতো এবং আওয়ামী লীগ যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকতো, ৮০-র দশকেই বাংলাদেশ হতো উন্নয়নে বিশ্বের বিষ্ময় এবং মধ্যম আয়ের দেশ। আর একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পনের মূহূর্তে বাংলাদেশ হতে পারত উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। বিগত দিনের মত দেশবাসীর সমর্থন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাথে থাকলে এবং বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যার ঘোষিত ভিষন-২০৪১ এর আলোকে দেশ যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই অচিরেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে  ক্ষুধা, দারিদ্র, বেকারমুক্ত, উচ্চ আয় সম্পন্ন উন্নত একটি রাষ্ট্র।

 

নববর্ষ ২০২১ এর সূচনায় এ শুভ শ্রত্যাশা নিয়ে সকলকে জানাই শুভ নববর্ষ। সকলের কল্যান হোক।

জয় বাংলা

জয় বঙ্গবন্ধু

জয়তু শেখ হাসিনা

বাংলাদেশ চিরজীবি হোক।

মো. রেজাউল করিম চৌধুরী,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত চসিক মেয়র পদপ্রার্থী

মুক্তমত


শেয়ার