আজকের সর্বশেষ

গাজি মার্কেট তরুণ প্রবাসী ঐক্য পরিষদের আয়োজনে প্রথমবারের মতো মেধাবৃত্তি পরীক্ষা-২০২৩ সম্পন্ন

চট্টগ্রামে দৈনিক ভোরের দর্পণের ২২ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান

সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় সম্মাননা পদক পেলেন রিয়াদুল মামুন সোহাগ

দৈনিক ভোরের দর্পণ পত্রিকার ২৩ বছর পূর্তিতে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা

শত বয়সী মাওলানা রফিক উল্লাহ'র ইন্তেকাল

বার্ষিক শুকরানা মাহফিল, পুরস্কার বিতরণ ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

বেসরকারি পর্যায়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবায় অসামান্য অবদানের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর কতৃক চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালকে সম্মাননা স্মারক প্রদান......

রোটারী ক্লাব অব চিটাগাং সাগরিকার বার্ষিক সভা সম্পন্ন


সিত্রাংয়ের আঘাত: উপকূলে বিপর্যয়, ৩ বিমানবন্দর বন্ধ, লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে





শেয়ার

উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। আজ দুপুরের মধ্যেই এটি উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করবে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত উপকূলীয় এলাকা। কয়েক লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল দিনভর বৃষ্টিপাত এবং রাতে জলোচ্ছ্বাসের কারণে অনেক এলাকা তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ফসলের। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গতকাল বিকাল থেকেই বন্ধ করে দেয়া হয় তিনটি বিমানবন্দর। লঞ্চসহ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি মনিটরিং সেল খোলা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায় মধ্য রাত থেকে উপকূলে আঘাত হানতে থাকে ঘূর্ণিঝড়। 

ঝড়ের কারণে মোংলা বন্দরে অ্যালার্ট থ্রি জারি করে পণ্য ওঠা- নামার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয় গতকাল বিকাল থেকেই।

বন্দরে অবস্থানরত ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ জেটি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নেয়। বাতিল করা হয় সুন্দরবনের কর্মকর্তা-বনরক্ষীদের ছুটি। সুন্দরবন থেকে সব দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপদে  লোকালয়ে নিয়ে আসা হয়। দুর্বল অবকাঠামো থাকায় বন্ধ করে  দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের ৩টি বন অফিস। বাগেরহাটের নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫  থেকে ৬ ফুট পানি বেড়ে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। 

 

বাগেরহাটে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্রসহ স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিকেল টিম। দুর্যেগ প্রস্তুতি সভায় বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। দুর্যোগের সময়ে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৩০ জন অশ্রয় নিতে পারবে। প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে নগদ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ২শ’ ৯৮ মেট্রিক টন চাল মজুত রয়েছে। 

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শাহীন মজিদ জানান, সোমবার সকালে মোংলা বন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। এই অবস্থায় মোংলা বন্দরে অ্যালার্ট থ্রি জারি করে পণ্য ওঠা নামার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়। ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরের  জেটি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। ঝড়ো হাওয়ার কারণে একটি কার-ক্যারিয়ারসহ পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজ মোংলা বন্দরে ঢুকতে পারেনি। একইভাবে পণ্য খালাস শেষ হওয়ার পরও ৩টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। বন্দর চ্যানেল নিরাপদ রাখতে লাইটার জাহাজগুলোকে পশুর চ্যানেল ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে নির্দেশ দিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। 

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সাগরের পানি স্বাভাবিক দিনের চেয়ে ৩-৪ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রে ঢেউের আকার বৃদ্ধি ও উত্তাল থাকায় পর্যটকদের সমুদ্রে নামতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কক্সবাজারে সরকারি কর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন। সোমবার সকাল থেকে দমকা হাওয়া ও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। এরপরও সারাদিন সৈকত ছেড়ে যায়নি কৌতূহলি পর্যটক বা স্থানীয়রা। সংকেতের মধ্যেও লোকজনের ভিড় দেখা গেছে। পর্যটকদের নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিয়ে মাইকিং করতে দেখা যায় লাইফগার্ড ও সৈকতকর্মীদের। তবে নির্দেশনা না মেনে অনেকে সমুদ্রে নামার চেষ্টা করেছেন। এজন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। 

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে কক্সবাজারে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণে বিলম্ব হয়েছে। সোমবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা ছিল ফ্লাইটটির। তবে বাতাসের কারণে সেটি অবতরণে বাধাগ্রস্ত হয়ে আকাশে প্রায় একঘণ্টা চক্কর দিতে থাকে। পরে ২টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটি নিরাপদে অবতরণ করাতে সক্ষম হন পাইলট। 

কক্সবাজার বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দরে উড্ডয়ন/অবতরণ কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক গোলাম মোর্তজা জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সোমবার বিকাল ৩টা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে উড্ডয়ন/অবতরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত উড্ডয়ন/অবতরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা সাপেক্ষে পরবর্তীতে উড্ডয়ন/অবতরণ কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২৯৮ মেট্টিক টন চাল, ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ১৮০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলের লোকজনকে সরিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে লক্ষ্মীপুরের নিমাঞ্চলগুলোতে। এরই মধ্যে চরগজারিয়া, ভয়ারচর, তেলিরচর,বড়খেরী, চর আলেকজান্ডার, সাহেবেরহাট, পাটওয়ারী, চররমণী মোহন, চরগাসিয়াসহ বেশকিছু এলাকা জোয়ারের পাঁচ থেকে সাত ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৭৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র। গঠন করা হয়েছে ৬৬টি মেডিকেল টিম। চরাঞ্চল থেকে মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে আসা হয়েছে। অন্যদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। লক্ষ্মীপুর, ভোলা এবং বরিশাল নৌরুটে ফেরি, লঞ্চসহ সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। সোমবার ভোররাত থেকে বন্ধ রয়েছে নৌ- যোগাযোগ। বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল থাকায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। 

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, টেকনাফে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর প্রভাবে সাগরের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছে। উপকূলীয় এলাকায়  স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে জোয়ারের পানি। সারাদিন হালকা-মাঝারি বাতাস বইছে। সারা দিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সতর্কতা জানিয়ে প্রশাসন ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও’র পক্ষ হতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলায় ৬ নং বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তবে এখনো উপজেলার কোথাও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

যবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি হওয়ায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. আব্দুর রশিদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস, পরীক্ষা ও অফিসসমূহ বন্ধ থাকবে। 

সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সোনাগাজীতে রোববার রাত থেকে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি ও ভারি বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। দমকা হাওয়ার ফলে থোড়সহ আমন ধান ও শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে  সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ৪৩টি সাইক্লোন সেল্টার মানুষদের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৪টি ইউনিয়নকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়ও প্রয়োজন হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি বহুতল ভবনগুলোও প্রস্তুত রাখা হবে। গৃহপালিত প্রাণির জন্যও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি সকল দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ফেনী জেলা প্রশাসক। 

জেলা প্রশাসক জীবন রক্ষায় দুর্যোগ উপদ্রুত এলাকার জনগণকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়ণ কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী জরুরি সেবা দেয়ার জন্য ৩টি মেডিকেল টিম গঠন করেছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে পাঁচটি রুটে চলাচলরত সবগুলো চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এসব লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বর্তমানে পাঁচটি রুটে লঞ্চ চলাচল করে। এরমধ্যে সানকেন ডেকের ৪৯টি, হাইডেকের দুটি লঞ্চ চলাচল করছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ রুটের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ রুটে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬-৭টা পর্যন্ত ২০ মিনিট পর পর লঞ্চ ছেড়ে যায়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর রুটে, মতলব-মাছুয়াখালী রুটে, হোমনা-রামচন্দ্রপুর রুটে, ওয়াপদা-নড়িয়া-ভোজেশ্বর (শরীয়তপুর) রুটে লঞ্চ চলাচল করে থাকে।  

নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করে থাকে। এরমধ্যে গজারিয়া, ষাটনল, মোহনপুর লঞ্চঘাটে লঞ্চ থামে ও যাত্রী ওঠানামা করে। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে মতলব-মাছুয়াখালী রুটের দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার। হোমনা-রামচন্দ্রপুর রুটে নারায়ণগঞ্জ থেকে রামচন্দ্রপুর পর্যন্ত দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার।  

নারায়ণগঞ্জ থেকে ওয়াপদা-নড়িয়া-ভোজেশ্বর (শরীয়তপুর) রুটের লঞ্চগুলো মোহনপুর, সুরেশ্বর, ওয়াপদা, নড়িয়া হয়ে ভোজেশ্বর পর্যন্ত চলাচল করে। নারায়ণগঞ্জ থেকে সুরেশ্বর পর্যন্ত দূরত্ব ৫১ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ওয়াপদা পর্যন্ত দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে নড়িয়া পর্যন্ত দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ভোজেশ্বর পর্যন্ত দূরত্ব ৬৬ কিলোমিটার।  

এদিকে লঞ্চ বন্ধ হলেও জরুরি প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়েই ট্রলারে করে যাত্রীদের মুন্সীগঞ্জ রুটে যাতায়াত করতে দেখা যায়। 

স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী জানান, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ইতিমধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে মানুষ। গতকাল ভোর থেকে বিভিন্ন উপজেলায় দমকা হাওয়ার সঙ্গে হালকা বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের পক্ষ থেকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভা করেছে। হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিনাজ উদ্দিন মানবজমিনকে জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নিঝুম দ্বীপে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বইছে। গতকাল সকাল থেকে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। 

নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের বান্ধাখালী, মোল্লা গ্রাম, মুন্সি গ্রাম ও মদিনা গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। হাতিয়াতে ২৪২টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ৩ হাজার ৫৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নোয়াখালী জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান জানান, নোয়াখালীর হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৩ লাখ লোক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন  ৪০১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মেডিকেল টিম ১০১টি ও ২শত ৫০ মেট্রিক চন চাল, নগদ ৫ লাখ টাকা, বিস্কুট ৭শ’ কার্টুন মজুত রাখা হয়েছে। একটি কন্ট্রোলরুম চালু করেছে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন। সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিলসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।  

স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে উপকূলীয়  জেলা খুলনায় দমকা বাতাসের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ উপকূলের ১৯টি জেলায় আঘাত হানতে পারে বলে আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। খুলনা জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জরুরি শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা, আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আসবেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আগতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার জন্য কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিশেষ করে কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাদের যাতে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া যায়-সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর প্রভাবে পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। গত রোববারর রাত থেকে উপকূলের বেশিরভাগ এলাকায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি হওয়ার ফলে রাস্তাঘাট, গ্রামগঞ্জসহ নিম্ন এলাকা ও রোপা আমন ক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। বিপাকে পড়েছেন কর্মজীবী শ্রমজীবী মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় পটুয়াখালীতে ১৩৫ দশমিক ০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহাবুবা সুখী জানান। কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। ঘূর্ণিঝড়, আমাবশ্যার জোঁ এবং সূর্যগ্রহণ একসঙ্গে হওয়ায় জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কায় রয়েছেন উপকূলবাসী।

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েছে প্রস্তুতি। এরমধ্যে ৪ লাখের অধিক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ কাজে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৫১১টি আশ্রয়কেন্দ্রসহ ১৪৪০টি বিদ্যালয় ও ৯টি মুজিব কেল্লা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে নিয়োজিত থাকবে ১৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবী। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় বেশ কয়েকটি জরুরি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে দুর্যোগকালীন জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জরুরি সেবা সেল চালু করা হয়। সাগরের তীরবর্তী উপজেলাসমূহে ইউএনও’র পক্ষ থেকে প্রস্তুতকৃত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত শুকনো খাবার ও ওষুধ প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগকালীন যেকোনো ধরনের ব্যয় নির্বাহের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। 

মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার জন্য চলমান রাখতে মাইকিং কার্যক্রম শুরু করারও সিদ্ধান্ত হয়। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়ছে। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী, ঘূর্ণিঝড়কালীন এবং পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বা তথ্য জানার জন্য ০১৩২০-১০৮৩৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য চট্টগ্রাম জেলাবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে। 

এ ছাড়াও যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ যোগাযোগ করতে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব সংকেত ‘অ্যালার্ট-৩ জারি করা হয়েছে এবং জাহাজ থেকে পণ্য উঠানো-নামানোর কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া শাহ আমানত বিমানবন্দরে সব ধরনের ফ্লাইট মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক খোলা থাকবে এই সেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। গতকাল বিকালে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নিম্নোক্ত হটলাইন নম্বর সার্বক্ষণিক খোলা থাকবে: ০১৭৬৯-০১০৯৮৬, ০২-৫৫০২৯৫৫০, ০২-৫৮১৫৩০২২, ফ্যাক্স ০২-৯১০২৪৬৯। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং আরও প্রবল আকার ধারন করলে মহা বিপদ সংকেত জারি করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। 

গতকাল সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং আরও উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে আসছে। গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ এটি দেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে পারে। এটি দেশের ১৩টি জেলায় মারাত্মকভাবে এবং দুটি জেলায় হালকাভাবে আঘাত হানতে পারে। ১৩ জেলার মধ্যে রয়েছে- সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, ভোলা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও বরিশাল। এ ছাড়া চট্টগ্রাম খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের বেশিরভাগ জায়গায় এটি আঘাত হানবে এবং চট্টগ্রাম ও কঙবাজারের দ্বীপ অঞ্চলগুলো বিশেষ করে মহেশখালী, সন্দ্বীপ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মঙ্গলবার নয়, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং সোমবার সন্ধ্যায় উপকূলে আঘাত হানতে পারে। উপকূলের সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শতভাগ মানুষকে সন্ধ্যার মধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ডা. এনামুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি সিভিয়ার সাইক্লোনে রূপান্তরিত হয়েছে। সিত্রাং পুরোটাই বাংলাদেশে আঘাত হানবে, ভারতে কোনো আঘাত হানবে না।

 

জাতীয়


শেয়ার