আজকের সর্বশেষ

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হলেন চট্টগ্রামের সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম, ও যুগ্ম মহাসচিব কেফায়েতুল্লাহ কায়সার

চ্যানেল কৃষি সন্মাননা পেলেন লেখক ও সংগঠক শামছুল আরেফিন শাকিল

চ্যানেল কৃষি সন্মাননা পেলেন নির্মাতা ও অভিনেতা মোশারফ ভূঁইয়া পলাশ

আইএফআইসি ব্যাংক শিবের হাট উপশাখা উদ্বোধন

জাপান বুঝিয়ে দিলো ফুটবল শুধু পশ্চিমের নয়

বাকবিশিস'র ১০ জাতীয় সম্মেলন সম্পন্ন : ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার সভাপতি, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত

অধ্যক্ষ শিমুল বড়ুয়া বাকবিশিস'র কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত

শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিতে বাকবিশিস'র প্রতিবাদ


উজ্জ্বল আমলনামা





শেয়ার

তার ঝুলিতে উজ্জ্বল আমলনামা। পেয়েছেন দেশের মানুষের ভালোবাসা  সত্য ও ন্যায়ের প্রতিক হিসাবে সাধারণের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। কবি, সাহিত্যিক, ছড়াকার, রম্যলেখক, খ্রমন কাহিনী- সাহিত্যের সকল শাখায় ছিল তার বিচরণ। একজন ঝানু আমলা হিসাবেও নাম কুঁড়িয়েছেন তিনি। সর্বশেষ নির্বাচন কমিশনার হিসাবে গোটা দেশের দৃষ্টি কাড়েন তিনি। এমন মানুষের হঠাৎ চলে যাওয়া? অপ্রস্তুত এ খবরে বুকটা মুচড়ে উঠে। মনটা কেঁদে উঠে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নীরবেই চলে গেলেন। পৃথিবীকে বিদায় জানালেন একেবারেই আকস্মিক। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে স্পষ্ট কথা বলার জন্য তিনি দেশবাসীর মনে জায়গা করে নেন।

বিজ্ঞাপন  

শেষ দিকে এসে তার বিস্ফোরক মন্তব্য- নির্বাচন আইসিইউতে, গণতন্ত্র লাইফ সাপোর্টে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি সবসময়ই ছিলেন স্পষ্টবাদী। দৈনিক মানবজমিনের আপনজন, শুভাকাঙ্ক্ষী মাহবুব তালুকদার। মানবজমিনে রম্য কলাম ‘চাচার পাঁচালী’ লিখে পাঠকের মন জয় করে নেন বহু আগেই। রাজনীতি, নির্বাচন, সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে তীর্যক মন্তব্য ফুটিয়ে তুলতেন তার এসব লেখায়। তাই তো নির্বাচন ভবন থেকে ফোন করে প্রায়ই বলতেন শামীম জানো, আমার নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পেছনে অবদান হলো মানবজমিনের। চাচার পাঁচালী আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। জানি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত তিনি। কিন্তু হঠাৎ এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাবেন এটা ছিল কল্পনার বাইরে। এই তো সেদিন ফোন করে বললেন, প্রধান সম্পাদক মহোদয় দেশে এলে তোমাদের দেখতে আসবো। কিন্তু দেখতে আসা আর হলো না। এমন তো কথা ছিল না, মাহবুব ভাই।  তার চাকরি জীবনে বঙ্গভবনে কাটিয়েছেন পাঁচটি বছর। 

 

চারজন প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করেছেন। ক’বছর আগে দেশ টিভির বেলা অবেলা সারাবেলা অনুষ্ঠানে মাহবুব তালুকদার তার জীবনের কিছু স্মৃতি তুলে ধরেন। আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থাপনায় ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বঙ্গভবনের করিডোর দিয়ে বঙ্গবন্ধু হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি আমাকে দেখলেন। আমাকে ডাকলেন। ডেকে আমাকে একটি কথাই বললেন-মাহবুব তুমি আমার সঙ্গে থাকবা। ইতিমধ্যে তথ্য সচিব জহিরুল হক ছুটে আসলেন। তিনি বললেন, স্যার আমরা নোটিফিকেশন করেছি। তখন বুঝলাম যে, আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আছি এবং থাকবো।  এ অনুষ্ঠানে মাহবুব তালুকদার বলেন, একটি ঘটনার কথা আমি বলি, বঙ্গবন্ধুর আব্বা যখন মারা গেলেন সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত ছিলাম এবং টেলিফোনটা আমিই সামাল দিচ্ছিলাম। উনার আব্বার চল্লিশার সময় উনি হঠাৎ ডেকে আমাকে বললেন, তুমি টুঙ্গিপাড়ায় আমার সঙ্গে চলো। আমি বললাম, ঠিক আছে স্যার। আমি বলতে গেলে এক কাপড়েই জাহাজে উঠে গেছি। জাহাজের কেবিনগুলোতে তিন বাহিনীর প্রধানরা ছিলেন, মন্ত্রী মহোদয়রা ছিলেন। তারা শুয়ে পড়েছেন। বঙ্গবন্ধুও শুয়ে পড়েছেন। জাহাজের সামনে সোফার মতো ছিল। সেই সোফায় আমি শুয়ে পড়লাম মাথার নিচে হাত দিয়ে। আর নিচে ছিল এডিসি রব্বানী। রাত দেড়টার দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি দেখলাম আমার মাথার নিচে একটা বালিশ। রব্বানী তখনো জেগে আছে। আমি রব্বানীকে জিজ্ঞেস করলাম, রব্বানী বালিশ কোথায় পেলে? রব্বানী বলেন, বঙ্গবন্ধু রাউন্ডে বেরিয়েছিলেন। আপনার সামনে এসে বলেন, মাহবুবকে একটা বালিশও জোগাড় করে দিতে পারলা না। 

এরপর বঙ্গবন্ধু তার নিজের ঘরে গিয়ে তার দুটো বালিশের একটা বালিশ আপনার মাথার তলে উনি দিয়ে গেছেন। কেঁদে ফেলেন মাহবুব তালুকদার। কাঁদতে কাঁদতে রব্বানীকে বলেন, রব্বানী আমি বালিশটা দিয়ে আসি। উনি বলেন, এটা এক ঘণ্টা আগের ব্যাপার। এখন উনি ঘুমিয়ে গেছেন হয়তো। উনাকে জাগাবেন না। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি উঠে বসে রইলাম। কখনো শুয়ে থাকি। কখনো বালিশটাকে বুকে ধরে বসে থাকি। এই ঘটনা আমার সারা জীবনকে গৌরবান্বিত করেছে। আমি ১৫ তারিখে সকালে উঠে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে চুমু খেয়েছি। আর বঙ্গভবনে পাঁচ বছর বইটি নিয়ে নিজের বই নিজে পড়েছি। এবং প্রতিটি শব্দের ভেতর দিয়ে আমি উনাকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। এই বইয়ের জন্য আমি চার বছর ওএসডি হয়ে ছিলাম। আমার বন্ধুরা বলেছিল, এই বই তুমি এখন ছেপো না। তাহলে তোমার চাকরি চলে যাবে। আমি বললাম গেলে যাবে। আমি তো একজন লেখক। ’৭৫-এর ১৪ই আগস্ট রামগতিতে একটা হেলিকপ্টার পড়ে যায়। ভারতের ৮ জন কর্নেল এবং তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মারা যান। একটা টেলিফোন আসল ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের। তিনি বললেন, এই খবরটা যেন আমরা পত্রিকায় না দেই। বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি এই খবর হাইড করবো না। যা ঘটেছে দেশের মানুষকে জানতে হবে। পরের দিন আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। 

বঙ্গবন্ধু আমাকে আগের দিনই বলেছিলেন, মোকাম্মেল সাহেব তখন শিক্ষা সচিব। উনি আসবেন। উনার সঙ্গে বসে তথ্যগুলো লিখে নিও। কিছুক্ষণ পর মোকাম্মেল সাহেব আমাকে ফোন করলেন। বললেন, মাহবুব আমি তো একটু অসুস্থ। তুমি হাতে তথ্যগুলো লিখে নাও। আমি বলে যাই। আমি বললাম, ঠিক আছে স্যার। উনি আমার শিক্ষক ছিলেন। উনার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটা বক্তৃতা আমি  মোটামুটি দাঁড় করালাম। এর মধ্যে সাড়ে ৮টার মতো বাজলো। বঙ্গবন্ধু চলে যাবেন। দেখেন মানুষের ভাগ্য কীভাবে মানুষকে বিভিন্ন ঘটনাক্রমে নিয়ে যায়। আমি বঙ্গবন্ধুর রুমের সামনে গেলাম। তখন তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন মাত্র। আমি উনাকে বললাম স্যার রাতে তো ফেয়ারওয়েল ডিনার হবে ফরাসউদ্দিন সাহেবের। উনি বিদেশে যাচ্ছেন। স্যার বললেন, তা তো জানি। খুব ছোট ঘটনা। স্যার আগে চলে গেলেন। আমি স্যারের গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। বিশ্বাস করেন এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। আমি রাত দেড়টার দিকে বাসায় ফিরলাম। উনার একটা টেপ রেকর্ডার থাকে আমার কাছে। যে রেকর্ডারে তিনি বক্তৃতা দিলে তা তুলে নেই। তারপর ফিরে এসে উনাকে আমি সেটা বাজিয়ে শোনাই। পরে ওই বক্তৃতাকে প্রেস ডিপার্টমেন্টে দিয়ে দেই। 

আরেকটা কাজ আমি করতাম। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর অনুলিখন। এটা আগে গাফ্‌ফার চৌধুরী সাহেব করতেন। তারপর তোয়াব খানও কিছুটা করেছিলেন। এই আত্মজীবনীটা পরবর্তীকালে উদ্ধারের জন্য আমি অনেক চেষ্টা করি। উনি ১৫ তারিখে চলে গেলেন। আমি ১৭ তারিখে বঙ্গভবনে গিয়ে আত্মজীবনীটা উদ্ধারের চেষ্টা করি। আমার হাতের লেখা অংশ আমার ড্রয়ারে ছিল। কিন্তু যে মেজর সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন ঘরে। আমি দেখলাম উনার সামনে বের করলে আত্মজীবনীও যাবে এবং আমিও চলে যাবো। আমি দেখলাম ড্রয়ার তালাবদ্ধ। আমি চলে আসলাম। আমি ১২ বছর পর আবার চেষ্টা করলাম। যেদিন শুনলাম এরশাদ সাহেব বঙ্গভবনে যত কাগজ আছে সব পুড়িয়ে দিতে বলেছেন। আমি তখন ওয়ার্কস মিনিস্ট্রিতে ডেপুটি সেক্রেটারি। আমি ওখানে গিয়ে বললাম, ভাই আমার লেখা একটা বই এটার মধ্যে ছিল আমাকে বইটা উদ্ধার করতে দাও। তারা আমাকে বললো, একটা কাগজও বাইরে যাবে না। সব পুড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আত্মজীবনীর সেই অংশের কিছুই পেলাম না।

আমি যা পেলাম কয়েকটা ফাইল। যার হেডিং ছিল অ্যাকশন এগিনেস্ট শেখ মুজিব। সেই ফাইলগুলো আমার কাছে আছে। আমি এখন এটার উপর কাজ করছি। বইয়ের নাম অ্যাকশন এগিনেস্ট শেখ মুজিব। পনের আগস্ট সকালে আমি বঙ্গভবনের গেইটে ফোন করলাম। ওখান থেকে ডিএসপি আমাকে বললো, স্যার খারাপ একটি ঘটনা। ৩২ নম্বরে গুলাগুলি হচ্ছে। ইতিমধ্যে এক আত্মীয় ফোন করলেন আমাকে। বললেন, আপনি রেডিও শুনেছেন। আমি বললাম, না।  তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুকে তো হত্যা করা হয়েছে। তারপর আমি ওখানে থাকা নিরাপদ মনে করলাম না। গোপীবাগে আমার আপন মামার বাসায় চলে আসলাম...।

 

জাতীয়


শেয়ার