বাজারে অসহায় ক্রেতা





শেয়ার

নিত্যপণ্যের দামে আগুন। লাগাম টানা যাচ্ছে না। সরকারি নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাজারে কিছুতেই ফিরছে না স্বস্তি। কিছুদিন পর পর অস্বাভাবিক দাম বাড়ছে একেকটি পণ্যের। একবার বাড়লে আর কমার কোনো লক্ষণ নেই। এখন অনেক নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামে অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই পিয়াজের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এরপর আর দাম কমেনি।

 

সংকট না থাকলেও বেড়েছে চালের দাম। এখন ২৫ টাকা কেজির আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকারও বেশি দরে। সরকারি সংস্থা বলছে, আলুর কোনো সংকট নেই। সবমিলিয়ে বাজারে ৩০ টাকার বেশি দাম হওয়ার কথা না। কিন্তু গত কয়েক দিনে কেন বাড়তি দামে আলু বিক্রি হচ্ছে এর কারণও কেউ বলতে পারছেন না। বাজারে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজির কমে কোনো সবজি নেই। অন্য অনেক নিত্যপণ্যেরও দাম সাধারণ ক্রেতাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিশেষ করে করোনায় আয় কমে যাওয়া মানুষজন এখন বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে। কম আয়ে সংসার চালাতে তাই হাপিত্যেস করছেন অনেকে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মে মাসে আলুর দাম ছিল প্রতিকেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা। জুলাইয়ে এসে দাম বেড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় ঠেকে। এতোদিন এই দাম স্থিতিশীল থাকার পর গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই হাফ সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে আলুর দাম। খুচরা বাজারে মান ও প্রকারভেদে সস্তা এই পণ্যটি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়েছে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি দিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সম্প্রতি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এদিকে পিয়াজের বাজারও অস্থির অনেক দিন থেকে। এখনো জরুরি এই পণ্যটির দাম চড়া। মান ভেদে দেশি পিয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। আর আমদানি করা পিয়াজ ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ওদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন অজুহাতে সবজির বাজার এখন অনেকটা বেসামাল। বাজারে ৭০-৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ সবজি। এরমধ্যে দুই একটি সবজির কেজি ১০০ ছাড়িয়েছে। বাজারে টমেটো এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শিম ১০০-১৩০, বরবটি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, বেগুনও ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে চালের দামও কোনো কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে মিল পর্যায়ে চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও এখনো বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে মোটা চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৫২ টাকায় ঠেকেছে। মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের কেজি ৫৭ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলারদের কারসাজিতে চালের দর বাড়তি। তারা সিন্ডিকেট করে মিল পর্যায় থেকে সব ধরনের চালের দর বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বাজারে আরো কিছু পণ্যের দাম চড়া।

শান্তিনগর বাজারের একজন সবজি বিক্রেতা জানান, বাজারে এখন সব সবজির দামই চড়া। বিশেষ করে টমেটো, কাঁচামরিচ, শিমসহ কয়েকটি সবজির আরো দাম বেশি। এ ছাড়া ৭০ টাকার নিচে কোনো সবজি বাজারে নেই। কাওরান বাজারের আলু বিক্রেতা জানান, পাল্লা প্রতি (৫ কেজি) আলু বিক্রি করছি ২৩০ থেকে ২৩৫ টাকায়। তবে ক্রেতা খুবই কম আসছে। তিনি বলেন, দাম বাড়লে তো আমাদের কিছু করার থাকে না। কারণ দাম বাড়ায় বড় ব্যবসায়ীরা। অথচ কাস্টমাররা আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।
হাতিরপুল কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা মোতালিব হোসেন বলেন, ছোট একটি চাকরি করি। বেতন যা পাই তা বাজার করতেই শেষ হয়ে যায়। এভাবে ঢাকা শহরে টেকা মুশকিল। আমরা ঢাকায় আসছি যেন কিছু আয় করতে পারি। অথচ আয়তো দূরের কথা বাসা ভাড়া-আর খাওয়ায় সব চলে যায়। বাজারে এসে দাম শুনলে মাথা ঘোরা শুরু হয়। প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেশি। এভাবে আর কতদিন। এই যে আপনারা এতো সংবাদ করেন। তাতেই বা কি লাভ হচ্ছে। সরকার কি এসব শুনছে? দেখছে? কোনো ব্যবস্থা তো নিতে দেখি না। মজুত করে যারা পণ্যের দাম বাড়ায় তারা কি সরকারের চেয়ে শক্তিশালী? তা না হলে দীর্ঘদিন ধরে একটা জিনিসের দাম এতো বেশি থাকে? পিয়াজ নিয়ে আর কেউ কথা বলছে না। আলু ৩০ থেকে ৫০ টাকা হইছে এটা নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু পিয়াজ তো এখনো ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটা জিনিসের দাম কোনো কারণে বাড়তে পারে, তাই বলে এতোদিন স্থায়ী থাকার নজির খুব কম দেশেই আছে।

ওদিকে দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিদিন জরিমানাও করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তারপরও কাজ হচ্ছে না। বিভিন্ন অজুহাতে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে তারা। কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বাজারে স্বস্তি ফিরবে না বলে মনে করেন ভোক্তারা। ওদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম প্রতিদিন সকালে বাজার মনিটরিং করে থাকে। এই টিমের নির্দেশনা দেয়া রয়েছে, প্রতিটি বাজারে যেন মূল্য তালিকা টানানো থাকে এবং সেই মূল্য তালিকা অনুযায়ী যেন পণ্যের দাম রাখে ব্যবসায়ীরা।

জাতীয়


শেয়ার