রাঙ্গুনিয়ায় একই পরিবারের ৬ সদস্য অপহৃত : উদ্ধার হয়নি এক মাসেও!





শেয়ার

সাইদুল ইসলাম (মাসুম) : রাঙ্গুনিয়ার ৬নং পোমরা ইউনিয়নের জনৈক আব্দুল হক-কে সন্ত্রাসী দ্বারা মারধর করে তার স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ৬ সদস্যকে অপহরনের পরে থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে পুলিশের নেতিবাচক কথাবার্তা এবং নীরব ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা তো অভিযোগ নেননি, উপরন্তু থানার ওসি সাফ জানিয়ে দেন তারা এ বিষয়ে কোন সহযোগীতা করতে পারবেন না।

 

জানা যায়, অভিযোগকারী আব্দুল হকের সাথে জান্নাতুল ফেরদৌসের গত ১৯৯৬ সালে ১৮ অক্টোবর বিয়ে হয়। পরে আব্দুল হক ও জান্নাতুল ফেরদৌস এর ঘরে ২টি সন্তান জন্মগ্রহণের পরও জান্নাতুল ফেরদৌস তার বড় বোনের স্বামী হারুণের সাথে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে ২ সন্তানকে আব্দুল হকের নিকট রেখে চলে যান এবং  হারুনের সাথে সংসার করাবস্থায় আব্দুল হকের সাথে তালাক সম্পাদন করেন।

 

এলাকা সূত্রে জানা যায়, হারুন সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক হওয়ায় তার হুমকী-ধমকীতে দেনমোহরানার পাওনাদি বিগত ১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারীতে জান্নাতুল ফেরদৌস-কে আব্দুল হক বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে উক্ত হারুনের সাথে সংসার করা অবস্থায় দীর্ঘ  প্রায় ৭ বছর পর হঠাৎ আব্দুল হক-কে বিভিন্ন ভয়-ভীতি দেখানোর মাধ্যমে হারুন সন্ত্রাসী লোকজন দ্বারা চাঁদা দাবী করে ও নারী-নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে দিবে বলে হুমকী ধমকী দিয়ে আব্দুল হকের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবীর মিথ্যা অভিযোগ করে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা দায়ের করে। যা বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-০৩, চট্টগ্রামে বিচারাধীন রয়েছে। উক্ত মামলায় আব্দুল হক হাজত বাস করে জামিনে বের হওয়ার পর এখনো জান্নাতুল ফেরদৌস বিভিন্ন সময়ে তার বোন জয়নাব বেগমের যোগসাজসে আব্দুল হককে নানা হুমকী-ধমকীসহ হয়রানীমূলক কাজে লিপ্ত থেকে বিভিন্ন সময়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ও জয়নাব বেগম ভাড়াটে সন্ত্রাসী  দিয়ে আব্দুল হকের নিকট হতে চাঁদা দাবী করে এবং না পেলে পুনরায় মিথ্যা মামলাসহ, নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে হয়রানী করবে বলে যাচ্ছে। তাছাড়া আব্দুল হকের ছোট ভাই আব্দুল জব্বারের সাথে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জের ধরে আব্দুল জব্বার ও ইমাম হোসেন রকি বিভিন্ন সময় আব্দুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে ঝগড়া বিবাদ করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টার দিকে আব্দুল হকের গৃহপালিত গরু-বাছুর আব্দুল জব্বারের গাছের পাতা খেয়ে ফেলার তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এবং পূর্ব বিরোধের জের ধরে আব্দুল জব্বার ও ইমাম হোসেন রকি আব্দুল হকের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয় ও তার ২য় স্ত্রী হালিমা বেগমকে এলোপাতাড়ী কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতর আঘাত করে। আব্দুল হক চিকিৎসা শেষে রাঙ্গুনীয় থানায় গিয়ে আব্দুল জব্বার ও ইমাম হোসেন রকির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলে থানা কর্তৃপক্ষ তদন্তের ভার এস.আই মোঃ সোহেলকে দিবে বলে জানায়।

 

ইতিমধ্যে আব্দুল জব্বার ও হালিমা বেগম থানায় অবস্থান করা অবস্থায় আব্দুল জব্বার ও ইমাম হোসেন রকি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে জান্নাতুল ফেরদৌস, জয়নাব বেগম, মহিউদ্দিন, ইয়াছিন আরফাত, সেলিম, টিপু ও মোঃ আলী দলবদ্ধভাবে আব্দুল হকের বাসায় গিয়ে আব্দুল হক ও তার ২য় স্ত্রী হালিমা বেগম থানা হতে বের হলে আব্দুল হকের ছোট বোন ঝর্না বেগম-কে মহি উদ্দিন, ইমাম হোসেন রকি ও ইয়াছিন আরফাত গলায় ছুরি ধরে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আব্দুল হকের মোবাইলে ফোন করে বলে ঝর্না বেগমের ডায়রিয়া হয়েছে, দ্রুত চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের নিকট নিয়ে যেতে হবে বলে আব্দুল হক-কে বাসায় আসতে বলে। আব্দুল হক উক্ত খবর শুনে দ্রুত বাসায় এসে ঢুকার সাথে সাথে সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধভাবে আব্দুল হক ও তার ২য় স্ত্রী হালিমা বেগমকে চারদিক থেকে জাপটে ধরে মোটা রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে এবং বিভিন্ন হুমকী-ধমকী দিয়ে বাসার আলমারিতে থাকা টাকা-পয়সা, অলংকার ও ২টি স্মার্টফোন নিয়ে যায় এবং আব্দুল হকের খামারে থাকা গরু-বাছুরগুলো নিয়ে যায়। পরবর্তীতে আব্দুল হকের পরিবারকে ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার সময় জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে উঠিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থল চার রাস্তার মোড়স্থ দোকানদার বাবুল সওদাগরসহ এলাকার অন্যান্যরা বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তাদের হুমকী-ধমকী দিয়ে লিচু বাগান সাবস্টেশন এলাকায় পাহাড়ের ভিতর একটি টিনের ঘরে আব্দুল হককে হাত-পা বেঁধে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন ও মারধর করে বিভিন্ন প্রকার ভয়-ভীতি দেখায়। তার বাসায় কোথায় কি দামী জিনিষপত্র ও টাকা-পয়সা আছে সেগুলো না বললে তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকী দিয়ে রাত ১১টার সময় আব্দুল হকের নিকট ৪০ লক্ষ টাকা  মুক্তিপন দাবী করে এবং তার ভিটে-সম্পত্তি আব্দুল জব্বার ও জান্নাতুল ফেরদৌস-কে রেজিষ্ট্রি করে দিতে বলে। মুক্তিপনের দাবীকৃত টাকা দিতে পারবে না বলাতে তৎক্ষণাৎ আব্দুল জব্বার ক্ষিপ্ত হয়ে আব্দুল হকের মাথায় লোহার রড দিয়ে বাড়ি মারলে আব্দুল হকের মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আব্দুল হক রক্তাক্ত অবস্থায় কোনমতে সেখান থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে লোকজনকে ডাকাডাকি করার পর সন্ত্রাসীরা তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেলে স্থানীয় নতুন পাড়ার  দেলোয়ার হোসেন সওদাগর দেখতে পেয়ে এলাকার লোকজনের সহায়তায় ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে সন্ত্রাসীদের না পেয়ে আব্দুল হক-কে স্থানীয় এনাম ও আব্দুর শুক্কুরের সহযোগীতায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ চিকিৎসার জন্য পাঠায়। সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে আব্দুল হক-এর ২য় স্ত্রী হালিমা বেগম, ঝর্না বেগম, ফাহিমা আক্তার, সিরাতুন নুর মিম, রেশমী আক্তার ও দৌলতুর রহমান-কে আটকে রাখে এবং আব্দুল হকের নিকট হতে দাবীকৃত মুক্তিপনের  টাকা না পেলে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকী দেয়। পরে আব্দুল হক ১২ই সেপ্টেম্বর চিকিৎসা শেষে উক্ত ঘটনার ব্যাপারে রাঙ্গুঁনীয়া থানায় উক্ত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে যান এবং পরিবারের সদস্যদের কোন খোঁজখবর না পাওয়ায় থানা কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা আব্দুল হককে কোন সহযোগীতা করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয় এবং আদালতে গিয়ে মামলা করার জন্য বলে।

 

এ বিষয়ে জানার জন্য রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মুঠোফোনে ফোন করলে অপরপ্রান্ত হতে নিজেকে ওসি পরিচয় দিয়ে প্রথমে ঘটনার পুরো বিষয়টি শুনেন। এই প্রতিবেদক ওসিকে যখন প্রশ্ন করেন থানায় অভিযোগ কেন নেয়া হয়নি? তখন কোন ধরণের জবাব দিতে না পেরে ফোন রিসিভকারী নিজেকে সেকেন্ড অফিসার পরিচয় দেন এবং প্রতিবেদককে থানায় গিয়ে ওসির সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে বলেন। পরক্ষণে তিনি আবার বলেন স্যার মিটিং-এ আছেন তাই ফোন আমি রিসিভ করেছি। স্যার মিটিং থেকে বের হলেই আপনাকে ফোন করতে বলবো। সন্ধ্যা ৬টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়ার থানার ওসি এই প্রতিবেদককে কোন ফোন করেননি।

 

৬নং পোমরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন জানান, আব্দুল হক নামে কোন ব্যক্তি আমার কাছে এমন অভিযোগ নিয়ে আসেনি। তবে এ বিষয়ে আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখবো।

 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১মাস যাবৎ এক পরিবারের ৬ সদস্য অপহৃত, বিষয়টা অবশ্যই চাঞ্চল্যকর। আমি আসলেই এ বিষয়ে কিছুই জানিনা বা আমাকে কেউ কিছুই জানায়নি। এখনই আপনার নিকট হতে জানতে পারলাম। আমি বিষয়টি নিয়ে ওসি সাহেবের সাথে কথা বলছি।

 

চট্টগ্রাম


শেয়ার