এটাই কি রাজাপাকসে পরিবারের শেষ?





শেয়ার

আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগে বাধ্য হলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে। এর আগেও তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার ভাই এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে। নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে সংকট সামাল দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সোমবার পরিস্থিতি রাজাপাকসেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেগতিক অবস্থায় পড়ে অবশেষে এদিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ। এক বিবৃতিতে তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সুবিধার্তে তিনি পদত্যাগ করছেন। 
ইতিহাসের সবথেকে বড় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু এ সংকটের জন্য রাজাপাকসে ভাইদেরই দুষছেন দেশটির আন্দোলনকারীরা। তারা দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। কিন্তু সোমবার রাজধানী কলম্বোতে আন্দোলনকারীদের উপরে হামলা চালায় প্রধানমন্ত্রীর সমর্থকরা। এরপরই ক্ষুব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে

বিজ্ঞাপন

এ সময় বাড়ির মধ্য থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়া হয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকট দূর হয়নি। আন্দোলনকারীরা এখন প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসেরও পদত্যাগ দাবি করছেন, আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। তাহলে এটাই কি শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাশালী রাজাপাকসে পরিবারের শেষ? 
গত দুই দশক ধরে দ্বীপরাষ্ট্রটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজাপাকসে ভাইয়েরা। তাদের পিতা ডন আলউইন রাজাপাকসে ছিলেন শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএলপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজেও দুই দফায় পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৪ সালে এসএলএলপি দলের প্রধান নির্বাচিত হন চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। তার অধীনেই রাজনীতিতে আসেন মাহিন্দ রাজাপাকসে। কুমারাতুঙ্গার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। এরপর একে একে রাজনীতিতে এসেছেন তার অন্য ভাইয়েরা। তার বড় ভাই চামাল এবং কাজিন নিরুপমাও রাজনীতিতে আছেন। 
কুমারাতুঙ্গার পর ২০০৫ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাহিন্দ। সে সময় গোটাবাইয়া ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। দুই ভাই মিলে শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগারদের পরাজিত করেন। ২০০৯ সালে তামিলদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়। এতে হাজার হাজার তামিল নিখোঁজ ও নিহত হন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে রাজাপাকসেরা আরও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবারের ঘনিষ্ঠদের বসাতে থাকেন দুই ভাই। 
২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাহিন্দ রাজাপাকসে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারও ফিরে আসেন মাহিন্দ। তখন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাথ্রিপালা সিরিসেনা। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রমাসিংহেকে সরিয়ে দিয়ে মাহিন্দকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পান। ২০২০ সালের পার্লামেন্টারি নির্বাচনেও জয় পান মাহিন্দ। রাজাপাকসে পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের রাজনীবিদ হচ্ছেন মাহিন্দ, গোটাবাইয়া এবং তাদের ভাই চামাল ও বসিল। চতুর্থ প্রজন্মও এরইমধ্যে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। মাহিন্দ ও চামালের সন্তান নামাল, ইয়োসিথা এবং শশীন্দ্র রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। বসিল নিজে একজন রাজনৈতিক কৌশলবিদ যিনি মাহিন্দর অধীনে অর্থনৈতিক বিষয়াদি সামলাতেন। সমপ্রতি তিনি দেশের অর্থমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। অপরদিকে চামাল পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। এছাড়া মাহিন্দ প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি বিমানমন্ত্রী ছিলেন। 
১৯৬০ সাল থেকেই শ্রীলঙ্কার মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন। রাজাপাকসেদের আমলেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হতে থাকে। শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক সাহায্য করেছে চীন। ক্ষমতা পেয়েই রাজাপাকসে সরকার প্রথমে চীন থেকে বিশাল ঋণ নিয়ে হাম্বানটোটায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে হাত দেন। তবে বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা পরে অনেক প্রকল্পই স্থগিত করতে বাধ্য হয়। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির ঋণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। দেশটির নাগরিকরা রাজাপাকসে পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। ফলে ২০১৫ সালে ক্ষমতা হারাতে হয় মাহিন্দকে। 
২০১৯ সালে ইস্টার বোম্বিং-এর পর দেশটিতে পর্যটন ব্যাহত হতে শুরু করে। মহামারি শুরু হলে এ অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কার পর্যটন একেবারেই ধ্বংসের দিকে পা বাড়ায়। এরমধ্যে গত এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করেন। এটিও অর্থনীতির উপরে চাপ বাড়ায়। এই সময় চীন থেকে বড় বড় ঋণ নিতে থাকে দেশটি। ২০২০-২১ সালে কলম্বোকে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয় চীনকে। এভাবে ক্রমশ রিজার্ভশূন্য হয়ে পড়ে দেশটি। খাদ্য কিংবা তেলের মতো জরুরি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কয়েক গুণ হয়ে যায়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। একপর্যায়ে তেলের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস প্রায়। দিনের বেশির ভাগ সময়েই আর বিদ্যুৎ থাকে না দেশটিতে। ওষুধের অভাবে দেশটির চিকিৎসা খাতও একদম খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়ার পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল সমগ্র শ্রীলঙ্কা। 
ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া গোটাবাইয়া। তিনি দুই দফায় দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। নিজের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে যে কোনো উপায়েই হোক এই সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। এমনকি বিরোধীদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু তাতে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। আবার বিরোধীদেরও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাই তারা নিজেরাও সরকার গঠন করতে পারছে না। এমন রাজনৈতিক সংকটই দেশটিতে সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে। আন্দোলনকারীরা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন প্রেসিডেন্টের উপরে। তবে এখনো গদি আঁকড়ে ধরে আছেন গোটাবাইয়া।

 

আন্তর্জাতিক


শেয়ার